কাপাসিয়ার শরীফ বিরানী হাউস ৪০০ টাকার শ্রমিক, আজ সফল উদ্যোক্তা
কাপাসিয়ার শরীফ বিরানী হাউস ৪০০ টাকার শ্রমিক, আজ সফল উদ্যোক্তা
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
একসময় মাসে মাত্র ৪০০ টাকা বেতনে হোটেলে শ্রমিকের কাজ করতেন। অভাব-অনটনের সংসারে দুই বেলা খাবার জোগাড় করাই ছিল সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। সেই মানুষটিই আজ নিজের পরিশ্রম, সততা ও সুস্বাদু খাবারের সুনামের জোরে গড়ে তুলেছেন সফল একটি ব্যবসা। এখন মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করার পাশাপাশি ১৮/২০ জন মানুষের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ত্রিশোর্ধ উদ্যোক্তা যুবক শরীফ হোসেন। কাপাসিয়া উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের দেওড়া মোড়ে অবস্থিত ‘শরীফ বিরিয়ানি হাউজ’ এখন শুধু একটি খাবারের দোকান নয়, বরং সুস্বাদু বিরিয়ানির জন্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত খাদ্যপ্রেমীদের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে ভিড় করেন এক প্লেট বিরিয়ানির স্বাদ নিতে।
জানা গেছে, দরিদ্র একটি পরিবারে জন্ম শরীফের। দিনমজুর বাবার সামান্য আয়ে দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে নিত্যদিন ছিল অভাবের ছাপ। এরই মধ্যে হঠাৎ বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন তিনি। প্রায় ৩৫ বছর আগে মাত্র ৪০০ টাকা মাসিক বেতনে একটি হোটেলে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ২২ বছর অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শরীফ বিরিয়ানি হাউজ’। শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে ২ কেজি চাউল দিয়ে। তবে খাবারের স্বাদ, মান এবং পরিমাণে ক্রেতাদের সন্তুষ্টি অর্জন করায় অল্প সময়েই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম। বর্তমানে সেখানে ১৮/২০ জন কর্মচারী কাজ করছেন। হোটেলে ১৫০ টাকায় এক প্লেট গরুর বিরিয়ানি এবং ১০০ টাকায় এক প্লেট মুরগির বিরিয়ানি বিক্রি করা হয়। তুলনামূলক কম দামে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও মাংস পরিবেশন করাই প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বলে জানান ক্রেতারা। কালীগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের
বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “অনেক দিন ধরেই শরীফ বিরিয়ানির নাম শুনছিলাম। আজ এসে খেয়ে বুঝলাম কেন এত সুনাম। দেড়শ টাকার বিরিয়ানিতে এত পরিমাণ খাবার দেওয়া হয় যে পুরোটা শেষ করাই কঠিন।” উত্তরায় ব্যবসা করা শহিদুল্লাহ সরকার বলেন, “ঘুরতে ঘুরতেই এখানে আসা। খাবারের স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি মাংসের পরিমাণও অনেক বেশি। পুরো প্লেট শেষ করতে পারিনি।” কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের আওড়াখালী বাজারের ব্যবসায়ী তৈয়বুর রহমান বলেন, “১৫০ টাকার বিরিয়ানিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ টুকরা গরুর মাংস থাকে। খাবারের মানও খুব ভালো। তাই সুযোগ পেলেই এখানে খেতে আসি।” হোটেলের এক কর্মচারী জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি বড় পাতিলে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। প্রতিটি পাতিলে প্রায় ২৫০ জনের খাবার থাকে। সে হিসেবে দৈনিক প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য বিরিয়ানি প্রস্তুত করা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য বেশি লাভ নয়, বরং ভালো মানের খাবার কম লাভে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। হোটেলের মালিক শরীফ হোসেন বলেন, “প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আমাদের হোটেল খোলা থাকে। গরুর মাংস স্থানীয় অভিজ্ঞ কসাইদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় এবং মুরগি হোটেলের সামনেই জবাই করা হয়। খাবারের মানের সঙ্গে কখনো আপস করি না। ক্রেতাদের সন্তুষ্টিই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।” স্থানীয়দের মতে, শরীফের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার গল্প। সীমিত পুঁজি,
কঠোর পরিশ্রম এবং সততার মাধ্যমে কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২০টি পরিবারের জীবিকাও নির্ভর করছে এই হোটেলের ওপর। শ্রমিক থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা শরীফের এই পথচলা প্রমাণ করে-ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও মানসম্পন্ন সেবা থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছোট উদ্যোগও একদিন মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হতে পারে। ###
নিউজটি আপডেট করেছেন : lifestyledesign847@gmail.com
কমেন্ট বক্স